মধ্য দুপুরের নিস্তব্ধতা যেন ঘন কুয়াশার মতো ঘরটাকে ঢেকে রেখেছিল। রান্নাঘরের ধোঁয়ার গন্ধে মাথা ঝিমঝিম করছিল অঙ্কিতার। রুমমেট বিদিশা অফিসের কাজে বাইরে—পুরো ফ্ল্যাটে আজ সে একাই।
হঠাৎই দরজায় ধাতব টোকা। শব্দটা এত স্পষ্ট যে মনে হলো কারও কপাল বা ধাতব আঙুল দরজায় ঠেকল।
দরজা খুলতেই অঙ্কিতা থমকে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে এক বয়স্কা নারী—চুল ছাইরঙা, পোশাক অদ্ভুতভাবে এলোমেলো, যেন অন্য সময় থেকে হেঁটে এসেছে। চোখে ঠান্ডা ধাতব ঝিলিক।
“তুমি কে?” অঙ্কিতা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
নারীটি কোনো উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকে সোফায় বসলেন। তারপর মৃদু স্বরে বললেন,
“এটা আমার বাড়ি… আমি এখানেই থাকতাম।”
কথাগুলো এলোমেলো, যেন পুরনো কোনো রেকর্ড বারবার বাজছে। অঙ্কিতার মনে হল—হয়তো কোনো মানসিক রোগী। তবু শরীরের ভেতর দিয়ে অচেনা এক শীতলতা ছুটে গেল।
সে রান্নাঘর থেকে জল আনতে ঘুরতেই দেখল, বৃদ্ধা পোশাকের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত ধাতব বস্তু বের করলেন—পিতলের মতো ঘূর্ণি, যার ওপর খোদাই করা জটিল চিহ্ন আর ক্ষীণ নীল আলো। তিনি দরজার ছিটকিনিতে সেটি ছোঁয়াতেই ঘরের বাতাস থমকে গেল, ঘড়ির কাঁটা যেন এক সেকেন্ড পিছিয়ে গেল।
ভয়ে অঙ্কিতা বৃদ্ধাকে বাইরে ঠেলে দিল, সেই বস্তুটিও ফেলে দিল। কিন্তু সেদিন থেকেই শুরু হলো প্রকৃত আতঙ্ক। প্রতিদিন ভোরে দরজার নিচ দিয়ে কেউ না কেউ ঢুকিয়ে দিচ্ছে শুকনো লাল পাতা, অচেনা ধাতব চিপ—যেন তন্ত্র আর বিজ্ঞানের মিশ্র বার্তা।
রাতে বিদিশাকে ফোনে বলতেই সে হেসে বলল,
“তুই বেশি ভাবছিস অঙ্কি। হ্যালুসিনেশন। তোর মাইগ্রেনই এসব করাচ্ছে।”
কিন্তু আজ দুপুরের টোকাটা আলাদা। শব্দ যেন চারদিক থেকে একসাথে আসছে। একা ঘরে দাঁড়িয়ে অঙ্কিতা বুঝল, এ শুধু ভয় নয়—কোনো অদৃশ্য শক্তির খেলা।
সে দরজা খুলল।
বৃদ্ধা নেই। শুধু দরজার সামনে পড়ে আছে এক ছোট্ট ধাতব চিপ, নীল আলোয় জ্বলছে।
অঙ্কিতা চিপটা তুলতেই ঘরের সব জানালা নিজে থেকেই খুলে গেল। বাতাস নেই, তবু পর্দা ফুঁপিয়ে উঠল। মেঝের টাইলস ঠান্ডা ধাতুর মতো বরফে রূপ নিল।
হঠাৎ মোবাইলের রিং। স্ক্রিনে বিদিশার নাম।
কিন্তু ভিডিও কলে ভেসে উঠল সেই বৃদ্ধার মুখ—চোখে যান্ত্রিক লেন্সের মতো আলো।
“সময় থেমে গেছে,” গম্ভীর যান্ত্রিক কণ্ঠ, “তোরা দুজন একই রেখায় নেই।”
অঙ্কিতা মোবাইল ফেলে দিল। দেয়ালের কোণ থেকে শোনা গেল ফিসফিসানি—দুটো নারী কণ্ঠ, স্পষ্ট নয়। তবু যেন বিদিশার গলাই।
“দরজা খোলিস না, অঙ্কি!” এবার কণ্ঠস্বর স্পষ্ট, যেন দেয়াল ভেদ করে আসছে।
কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটা কণ্ঠ—বৃদ্ধার, ধাতব ও যান্ত্রিক:
“এখনই খোল, নাহলে সময়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।”
দুটি কণ্ঠ, দুটি বাস্তব। অঙ্কিতা হাত বাড়াল দরজার নবের দিকে। স্পর্শ করতেই ঘরের প্রতিটি কণিকা বাতাসে ঝুলে গেল, সময় যেন তরল হয়ে পড়ল।
তারপর—এক ঝলক আলো।
আর আমি কোথায় আছি, বুঝতে পারলাম না। বিদিশা? বৃদ্ধা? নাকি আমি নিজেই আমার ছায়া?
এক ঝলক নীল আলো… তারপর অন্ধকার।
চোখ খুলে অঙ্কিতা বুঝল—সে বিছানায়। ঘর নিস্তব্ধ, বিদিশা এখনো ফেরেনি। সব যেন এক স্বপ্ন।
কিন্তু টেবিলের উপর ছোট্ট সেই ধাতব বস্তুটা এখনো চকচক করছে, নীল আলো ঝলকাচ্ছে।
দরজার বাইরে আবার সেই ছন্দময় টোকা—
ঠক… ঠক… ঠক…
No comments:
Post a Comment