Thursday, 25 September 2025

পুজোয় প্যান্ডেল ঘোরার বিভ্রাট

চারিদিক ধূপের গন্ধে ম-ম করছিল আর দূরে ভেসে আসছিল ঢাকের শব্দ। আমরা দুজন বেরিয়ে পড়েছিলাম দুর্গাপূজা দেখার জন্য। আমি ওকে প্রস্তাব দিলাম ভিড় এড়াতে আগেভাগে রাতের খাবার খেয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু খেতে খেতে অনেক দেরি হয়ে গেল, প্রায় রাত সাড়ে দশটা বেজে গেল। তবে এটা প্যান্ডেল ঘোরার জন্য একটা ভালো সময় ছিল।

আমরা ওয়েটারকে বলেছিলাম আমাদের জন্য খাবার রেখে দিতে, কারণ আমাদের এক বন্ধু বাপিদা আসার কথা ছিল। এরপর আমরা দুজন দুদিকে চলে গেলাম। কিন্তু আমি দেখলাম আমার স্কুলের বন্ধুরা গোল হয়ে হাত ধরে খেলছিল। এটা দেখে আমার মনটা আনন্দে ভরে উঠল। আমি ওর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, "আমি কি একটু খেলতে যাব?"

"হ্যাঁ, যা না," ও হাসিমুখে বলল।

আমি দৌড়ে বন্ধুদের কাছে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পর আমি খেলার মধ্যে এতটাই ডুবে গেলাম যে চারপাশের কথা আমার মনেই ছিল না। হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলাম। অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। এবার ঠাকুর দেখতে হবে। আমি ঠাকুরের সৌন্দর্য দেখতে খুব পছন্দ করি। কিন্তু আমার মনটা কেন যেন অস্থির লাগছিল।

আমি তোমাকে খুঁজতে শুরু করলাম, কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলাম না। আমার খুব ভয় হতে লাগলো। আমি বারবার তোমাকে ফোন করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু প্রতিবারই ভুল নম্বর লেগে যাচ্ছিল। আমার ভয় আরও বেড়ে গেল। এভাবেই প্রায় দুই ঘণ্টা কেটে গেল।

হঠাৎ আমি পরিচিত একটি মুখ দেখতে পেলাম—দর্পণ। সে আমাকে দেখে বলল, "এখানে নবীন দা আছে।"

আমি দৌড়ে সেখানে গেলাম। আমি একটা টাটা সুমো গাড়ি দেখতে পেলাম এবং তার ভেতরে একদল লোক ছিল, কিন্তু কোনো মেয়ে ছিল না। আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। আমি তোমাকে খুঁজে পেলাম না। আমি যখন তোমাকে খুঁজছিলাম, তখন কেউ একজন আমাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে গাড়ির মধ্যে ঢোকাতে চেষ্টা করল। ভয়ে আমার মনে সাহস এলো। আমি কোনোভাবে ওদের সাথে লড়াই করে পালিয়ে আসলাম। আমার খুব ভয় করছিল। আমি দৌড়ে ঠাকুরের মণ্ডপে ঢুকে গেলাম।

অবশেষে, আমি তোমাকে ফোন করতে পারলাম। কিন্তু আমার স্বস্তি মুহূর্তেই দুঃখে পরিণত হলো। তুমি আমাকে ছেড়ে একাই ঠাকুর দেখতে চলে গিয়েছিলে।

আমার চোখে জল চলে এলো। আমি পাচার হয়ে যাচ্ছিলাম আর তুমি আমাকে একা ফেলে চলে গেলে। আমি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম। তুমি আমাকে সান্ত্বনা দিতে চাইলে। তুমি বললে যে তুমি আগে চলে এসেছিলে কারণ ভেবেছিলে আমি খেলতে ব্যস্ত আছি, তাই আমাকে ছাড়া চলে যাওয়ায় তেমন কোনো সমস্যা হবে না।

তোমার কথায় আমার মনের কষ্ট একটুও কমলো না। আমি সবেমাত্র একটা দুঃস্বপ্ন থেকে ফিরে এসেছি, আর যার ওপর আমার সবচেয়ে বেশি ভরসা ছিল, সেই আমাকে একা ফেলে চলে গিয়েছিল। এটা আমার কাছে খুব বড় একটা শিক্ষা ছিল, যেখানে অপ্রত্যাশিত বিপদ লুকিয়ে থাকে।

Wednesday, 24 September 2025

স্বপ্ন ঘোর - দরজায় টোকা


মধ্য দুপুরের নিস্তব্ধতা যেন ঘন কুয়াশার মতো ঘরটাকে ঢেকে রেখেছিল। রান্নাঘরের ধোঁয়ার গন্ধে মাথা ঝিমঝিম করছিল অঙ্কিতার। রুমমেট বিদিশা অফিসের কাজে বাইরে—পুরো ফ্ল্যাটে আজ সে একাই।

হঠাৎই দরজায় ধাতব টোকা। শব্দটা এত স্পষ্ট যে মনে হলো কারও কপাল বা ধাতব আঙুল দরজায় ঠেকল।

দরজা খুলতেই অঙ্কিতা থমকে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে এক বয়স্কা নারী—চুল ছাইরঙা, পোশাক অদ্ভুতভাবে এলোমেলো, যেন অন্য সময় থেকে হেঁটে এসেছে। চোখে ঠান্ডা ধাতব ঝিলিক।

“তুমি কে?” অঙ্কিতা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।

নারীটি কোনো উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকে সোফায় বসলেন। তারপর মৃদু স্বরে বললেন,
“এটা আমার বাড়ি… আমি এখানেই থাকতাম।”

কথাগুলো এলোমেলো, যেন পুরনো কোনো রেকর্ড বারবার বাজছে। অঙ্কিতার মনে হল—হয়তো কোনো মানসিক রোগী। তবু শরীরের ভেতর দিয়ে অচেনা এক শীতলতা ছুটে গেল।

সে রান্নাঘর থেকে জল আনতে ঘুরতেই দেখল, বৃদ্ধা পোশাকের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত ধাতব বস্তু বের করলেন—পিতলের মতো ঘূর্ণি, যার ওপর খোদাই করা জটিল চিহ্ন আর ক্ষীণ নীল আলো। তিনি দরজার ছিটকিনিতে সেটি ছোঁয়াতেই ঘরের বাতাস থমকে গেল, ঘড়ির কাঁটা যেন এক সেকেন্ড পিছিয়ে গেল।

ভয়ে অঙ্কিতা বৃদ্ধাকে বাইরে ঠেলে দিল, সেই বস্তুটিও ফেলে দিল। কিন্তু সেদিন থেকেই শুরু হলো প্রকৃত আতঙ্ক। প্রতিদিন ভোরে দরজার নিচ দিয়ে কেউ না কেউ ঢুকিয়ে দিচ্ছে শুকনো লাল পাতা, অচেনা ধাতব চিপ—যেন তন্ত্র আর বিজ্ঞানের মিশ্র বার্তা।

রাতে বিদিশাকে ফোনে বলতেই সে হেসে বলল,
“তুই বেশি ভাবছিস অঙ্কি। হ্যালুসিনেশন। তোর মাইগ্রেনই এসব করাচ্ছে।”

কিন্তু আজ দুপুরের টোকাটা আলাদা। শব্দ যেন চারদিক থেকে একসাথে আসছে। একা ঘরে দাঁড়িয়ে অঙ্কিতা বুঝল, এ শুধু ভয় নয়—কোনো অদৃশ্য শক্তির খেলা।

সে দরজা খুলল।
বৃদ্ধা নেই। শুধু দরজার সামনে পড়ে আছে এক ছোট্ট ধাতব চিপ, নীল আলোয় জ্বলছে।

অঙ্কিতা চিপটা তুলতেই ঘরের সব জানালা নিজে থেকেই খুলে গেল। বাতাস নেই, তবু পর্দা ফুঁপিয়ে উঠল। মেঝের টাইলস ঠান্ডা ধাতুর মতো বরফে রূপ নিল।

হঠাৎ মোবাইলের রিং। স্ক্রিনে বিদিশার নাম।
কিন্তু ভিডিও কলে ভেসে উঠল সেই বৃদ্ধার মুখ—চোখে যান্ত্রিক লেন্সের মতো আলো।
“সময় থেমে গেছে,” গম্ভীর যান্ত্রিক কণ্ঠ, “তোরা দুজন একই রেখায় নেই।”

অঙ্কিতা মোবাইল ফেলে দিল। দেয়ালের কোণ থেকে শোনা গেল ফিসফিসানি—দুটো নারী কণ্ঠ, স্পষ্ট নয়। তবু যেন বিদিশার গলাই।

“দরজা খোলিস না, অঙ্কি!” এবার কণ্ঠস্বর স্পষ্ট, যেন দেয়াল ভেদ করে আসছে।

কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটা কণ্ঠ—বৃদ্ধার, ধাতব ও যান্ত্রিক:
“এখনই খোল, নাহলে সময়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।”

দুটি কণ্ঠ, দুটি বাস্তব। অঙ্কিতা হাত বাড়াল দরজার নবের দিকে। স্পর্শ করতেই ঘরের প্রতিটি কণিকা বাতাসে ঝুলে গেল, সময় যেন তরল হয়ে পড়ল।

তারপর—এক ঝলক আলো।
আর আমি কোথায় আছি, বুঝতে পারলাম না। বিদিশা? বৃদ্ধা? নাকি আমি নিজেই আমার ছায়া?

এক ঝলক নীল আলো… তারপর অন্ধকার।

চোখ খুলে অঙ্কিতা বুঝল—সে বিছানায়। ঘর নিস্তব্ধ, বিদিশা এখনো ফেরেনি। সব যেন এক স্বপ্ন।

কিন্তু টেবিলের উপর ছোট্ট সেই ধাতব বস্তুটা এখনো চকচক করছে, নীল আলো ঝলকাচ্ছে।

দরজার বাইরে আবার সেই ছন্দময় টোকা—
ঠক… ঠক… ঠক…